ঢাকা    শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
খোলা বার্তা

বগুড়ার শালফায় দুই শতাব্দীর নবান্ন উৎসবে গ্রামজুড়ে আনন্দের ঢেউ



বগুড়ার শালফায় দুই শতাব্দীর নবান্ন উৎসবে গ্রামজুড়ে আনন্দের ঢেউ

বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার শালফা গ্রামে প্রায় দুইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবকে ঘিরে উৎসবে মেতেছে গ্রামবাসী। নতুন ধান তুলেই পিঠা-পুলি, পায়েশসহ নানারকম দেশীয় খাবার তৈরির মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই উৎসব। পাশাপাশি ১২টি গরু ও ১৪টি মহিষের মাংস রান্না করে আত্মীয়-স্বজন ও অতিথি আপ্যায়নের ধুম পড়ে প্রতিটি ঘরে। উৎসবকে ঘিরে বসেছে বিশাল এক মেলা, যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই ভিড় জমিয়েছে।

এলাকার প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শালফায় নবান্ন উৎসবের সঠিক সূচনাকাল অজানা হলেও বংশ পরম্পরায় প্রায় দুই শতাব্দী ধরে কৃষক পরিবারগুলো এই উৎসব পালন করে আসছে। এলাকার প্রায় সাত হাজার কৃষক পরিবার আমন ধান কাটা-মাড়াই শেষে নতুন ধানের চাল দিয়ে উৎসবের সম্পূর্ণ আমেজে অংশ নেন। প্রতিটি বাড়িতেই কয়েকদিন আগে থেকে ঢেঁকিতে চাল ভাঙ্গা, পিঠা তৈরির প্রস্তুতি, অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন—সবই চলে উৎসাহ-উদ্দীপনায়।


নবান্ন উপলক্ষে মেয়ে, মেয়ে জামাইসহ দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজনরা এই গ্রামে বেড়াতে আসেন। পাড়া-প্রতিবেশীর মিলনমেলায় মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। শালফা ছাড়িয়ে এই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে পাশের পালোয়ানপাড়া, কমারপুর, কালাইকুরি, সাগরপুর, ছোট আখিরা, বড় আখিরা, নিমাইদীঘিসহ কয়েকটি গ্রামেও। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক হয়ে উৎসব পালন করেন।


গ্রামবাসীর ঐতিহ্য অনুযায়ী এবারও ১৪টি মহিষ ও ১২টি গরু ক্রয় করে সম্মিলিতভাবে জবাই করা হয়। পরে মাংস ভাগ করে বাড়ি বাড়ি রান্না করা হয়। বিশেষ করে মহিষের মাংস দিয়ে নানা পদের খাবার তৈরি করে আপ্যায়ন করা হয় আত্মীয়-স্বজনদের। উৎসবের আগের দিন মহিষগুলো গ্রামজুড়ে ঘুরিয়ে জানিয়ে দেওয়ার প্রথাটিও এখনও অক্ষুণ্ন রয়েছে।


উৎসবকে ঘিরে বসা মেলাটিও ছিল অন্যতম আকর্ষণ। নাগরদোলা, বেলুন, ঘোড়ার গাড়ি, চুড়ি, কসমেটিকস, মিষ্টান্নসহ নানা পণ্যের দোকানে ছিল উপচেপড়া ভিড়। পাড়ায় পাড়ায় অনুষ্ঠিত হয় মোরগ লড়াই, রশি টানাটানি ও অন্যান্য গ্রামীণ খেলাধুলা।


গ্রামবাসীরা জানান, নবান্ন উৎসবের আনন্দ অনেক সময় ঈদের আনন্দকেও ছাড়িয়ে যায়। এটি নতুন ফসলের স্বাদ ভাগাভাগি করার পাশাপাশি পরিবার-পরিজনের মিলন এবং পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করার এক বিরল উপলক্ষ।


৭২ বছর বয়সী আফজাল হোসেন বলেন, “শৈশবে দেখেছি দাদি-দাদাকে নতুন ধানের চাল দিয়ে পিঠা বানাতে। তখনই মহিষের মাংস রান্নার চল ছিল। আত্মীয়-স্বজন তো থাকতই, আশপাশের লোকজনও খেতে আসতো। এখন আয়োজন আরও বড় হয়েছে।”


আদমদীঘি রহিম উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও শালফা গ্রামের বাসিন্দা মো. শেফাউর রহমান তালুকদার জানান, “ইতিহাস বলে প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই গ্রামে নবান্ন উৎসব চলে আসছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত থাকে মেলা, খেলাধুলা আর অতিথি আপ্যায়নের ধুম। মূলত এটি একদিনের উৎসব হলেও আমেজ থাকে প্রায় তিন দিন।”


গ্রামজুড়ে জেগে ওঠা এই নবান্নের আনন্দ যেন নতুন ফসলের সুবাসে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

আপনার মতামত লিখুন

খোলা বার্তা

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬


বগুড়ার শালফায় দুই শতাব্দীর নবান্ন উৎসবে গ্রামজুড়ে আনন্দের ঢেউ

প্রকাশের তারিখ : ১৭ নভেম্বর ২০২৫

featured Image

বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার শালফা গ্রামে প্রায় দুইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবকে ঘিরে উৎসবে মেতেছে গ্রামবাসী। নতুন ধান তুলেই পিঠা-পুলি, পায়েশসহ নানারকম দেশীয় খাবার তৈরির মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই উৎসব। পাশাপাশি ১২টি গরু ও ১৪টি মহিষের মাংস রান্না করে আত্মীয়-স্বজন ও অতিথি আপ্যায়নের ধুম পড়ে প্রতিটি ঘরে। উৎসবকে ঘিরে বসেছে বিশাল এক মেলা, যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই ভিড় জমিয়েছে।

এলাকার প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শালফায় নবান্ন উৎসবের সঠিক সূচনাকাল অজানা হলেও বংশ পরম্পরায় প্রায় দুই শতাব্দী ধরে কৃষক পরিবারগুলো এই উৎসব পালন করে আসছে। এলাকার প্রায় সাত হাজার কৃষক পরিবার আমন ধান কাটা-মাড়াই শেষে নতুন ধানের চাল দিয়ে উৎসবের সম্পূর্ণ আমেজে অংশ নেন। প্রতিটি বাড়িতেই কয়েকদিন আগে থেকে ঢেঁকিতে চাল ভাঙ্গা, পিঠা তৈরির প্রস্তুতি, অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন—সবই চলে উৎসাহ-উদ্দীপনায়।


নবান্ন উপলক্ষে মেয়ে, মেয়ে জামাইসহ দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজনরা এই গ্রামে বেড়াতে আসেন। পাড়া-প্রতিবেশীর মিলনমেলায় মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। শালফা ছাড়িয়ে এই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে পাশের পালোয়ানপাড়া, কমারপুর, কালাইকুরি, সাগরপুর, ছোট আখিরা, বড় আখিরা, নিমাইদীঘিসহ কয়েকটি গ্রামেও। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক হয়ে উৎসব পালন করেন।


গ্রামবাসীর ঐতিহ্য অনুযায়ী এবারও ১৪টি মহিষ ও ১২টি গরু ক্রয় করে সম্মিলিতভাবে জবাই করা হয়। পরে মাংস ভাগ করে বাড়ি বাড়ি রান্না করা হয়। বিশেষ করে মহিষের মাংস দিয়ে নানা পদের খাবার তৈরি করে আপ্যায়ন করা হয় আত্মীয়-স্বজনদের। উৎসবের আগের দিন মহিষগুলো গ্রামজুড়ে ঘুরিয়ে জানিয়ে দেওয়ার প্রথাটিও এখনও অক্ষুণ্ন রয়েছে।


উৎসবকে ঘিরে বসা মেলাটিও ছিল অন্যতম আকর্ষণ। নাগরদোলা, বেলুন, ঘোড়ার গাড়ি, চুড়ি, কসমেটিকস, মিষ্টান্নসহ নানা পণ্যের দোকানে ছিল উপচেপড়া ভিড়। পাড়ায় পাড়ায় অনুষ্ঠিত হয় মোরগ লড়াই, রশি টানাটানি ও অন্যান্য গ্রামীণ খেলাধুলা।


গ্রামবাসীরা জানান, নবান্ন উৎসবের আনন্দ অনেক সময় ঈদের আনন্দকেও ছাড়িয়ে যায়। এটি নতুন ফসলের স্বাদ ভাগাভাগি করার পাশাপাশি পরিবার-পরিজনের মিলন এবং পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করার এক বিরল উপলক্ষ।


৭২ বছর বয়সী আফজাল হোসেন বলেন, “শৈশবে দেখেছি দাদি-দাদাকে নতুন ধানের চাল দিয়ে পিঠা বানাতে। তখনই মহিষের মাংস রান্নার চল ছিল। আত্মীয়-স্বজন তো থাকতই, আশপাশের লোকজনও খেতে আসতো। এখন আয়োজন আরও বড় হয়েছে।”


আদমদীঘি রহিম উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও শালফা গ্রামের বাসিন্দা মো. শেফাউর রহমান তালুকদার জানান, “ইতিহাস বলে প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই গ্রামে নবান্ন উৎসব চলে আসছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত থাকে মেলা, খেলাধুলা আর অতিথি আপ্যায়নের ধুম। মূলত এটি একদিনের উৎসব হলেও আমেজ থাকে প্রায় তিন দিন।”


গ্রামজুড়ে জেগে ওঠা এই নবান্নের আনন্দ যেন নতুন ফসলের সুবাসে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।


খোলা বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. একরামুল হক
✆ ০১৯২৮-৩১৩১২০
প্রধান নির্বাহী : সাইদুল ইসলাম আবির।
✆ ০১৭৫০-৭০৭৬৩৬
ই মেইল: kholabartaonline@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ খোলা বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত