ঢাকা    সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
খোলা বার্তা

অবৈধ কাঠ পাচারে বিপন্ন রাঙ্গুনিয়ার বন, পরিবেশ ধ্বংসের শঙ্কা



অবৈধ কাঠ পাচারে বিপন্ন রাঙ্গুনিয়ার বন, পরিবেশ ধ্বংসের শঙ্কা

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার খুরুশিয়া রেঞ্জ, পোমরা বিট ও কোদালা বনাঞ্চলসহ কাপ্তাই সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে কাঠ পাচারকারী সিন্ডিকেটের প্রধান অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দিনের আলোয় এবং রাতের অন্ধকারে সমান তালে চলছে মূল্যবান সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিধনের মহোৎসব। স্থানীয়ভাবে পরিচিত চাঁদের গাড়ি, জিপ ও ট্রাকযোগে এসব কাঠ পাচার করা হচ্ছে রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করে। এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চল দ্রুত উজাড় হয়ে যাচ্ছে, যা একদিকে যেমন বনভূমির আয়তন সংকুচিত করছে, অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। মূলত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র স্থানীয় সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, বন বিভাগের পোমরা ফাঁড়িসহ বিভিন্ন চেকপোস্টে নিয়মিত মাসোহারা প্রদানের মাধ্যমে কাঠবোঝাই যানবাহনগুলো নির্বিঘ্নে পার হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মাঝেমধ্যে যে কয়েকটি গাড়ি আটক করা হয় তা কেবল লোক দেখানো অভিযান মাত্র, যার মূল উদ্দেশ্য হলো পাচারকারী সিন্ডিকেটের সাথে দহরম-মহরম সম্পর্ক বজায় রাখা। পাচার হওয়া এই কাঠের একটি বিশাল অংশ অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বায়ুদূষণের মাত্রাকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এছাড়া কাঠবোঝাই দ্রুতগতির চাঁদের গাড়িগুলো স্থানীয় সড়কে যাতায়াতের সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। অতীতে এসব গাড়ির ধাক্কায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, যা স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে।


তবে কাঠ পাচারের এই ভয়াবহ চিত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা গেছে। পোমরা রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিদ্দিক জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, আসামিরা জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহরাজ উদ্দিন মাসোহারার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং নিয়মিত অভিযানের দাবি করেছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পোমরা বার আউলিয়া, কাদের নগর ও কোদালা পাহাড়ি এলাকায় প্রকাশ্যে গাছ কাটার উৎসব চললেও সেখানে বন বিভাগের তেমন কোনো দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ নেই। বন আইনের ১৯২৭ সালের বিধান অনুযায়ী সংরক্ষিত বন থেকে গাছ কাটা ও পাচার দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও, যথাযথ নজরদারি ও আইনি প্রয়োগের অভাবে অসাধু চক্রগুলো বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।


বন উজাড়ের এই নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী, যা অদূর ভবিষ্যতে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলকে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে। পরিবেশবিদদের মতে, কার্বন শোষণের সক্ষমতা হারিয়ে বনভূমি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়েছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়বে স্থানীয় জনজীবনে। কাঠ পাচারের এই দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হলে কেবল লোক দেখানো অভিযান নয়, বরং বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সাথে চেকপোস্টগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে পাচারকারী সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং অবৈধ ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়গুলো অচিরেই বৃক্ষশূন্য খাঁ খাঁ প্রান্তরে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

খোলা বার্তা

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬


অবৈধ কাঠ পাচারে বিপন্ন রাঙ্গুনিয়ার বন, পরিবেশ ধ্বংসের শঙ্কা

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার খুরুশিয়া রেঞ্জ, পোমরা বিট ও কোদালা বনাঞ্চলসহ কাপ্তাই সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে কাঠ পাচারকারী সিন্ডিকেটের প্রধান অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দিনের আলোয় এবং রাতের অন্ধকারে সমান তালে চলছে মূল্যবান সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিধনের মহোৎসব। স্থানীয়ভাবে পরিচিত চাঁদের গাড়ি, জিপ ও ট্রাকযোগে এসব কাঠ পাচার করা হচ্ছে রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করে। এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চল দ্রুত উজাড় হয়ে যাচ্ছে, যা একদিকে যেমন বনভূমির আয়তন সংকুচিত করছে, অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। মূলত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র স্থানীয় সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, বন বিভাগের পোমরা ফাঁড়িসহ বিভিন্ন চেকপোস্টে নিয়মিত মাসোহারা প্রদানের মাধ্যমে কাঠবোঝাই যানবাহনগুলো নির্বিঘ্নে পার হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মাঝেমধ্যে যে কয়েকটি গাড়ি আটক করা হয় তা কেবল লোক দেখানো অভিযান মাত্র, যার মূল উদ্দেশ্য হলো পাচারকারী সিন্ডিকেটের সাথে দহরম-মহরম সম্পর্ক বজায় রাখা। পাচার হওয়া এই কাঠের একটি বিশাল অংশ অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বায়ুদূষণের মাত্রাকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এছাড়া কাঠবোঝাই দ্রুতগতির চাঁদের গাড়িগুলো স্থানীয় সড়কে যাতায়াতের সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। অতীতে এসব গাড়ির ধাক্কায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, যা স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে।


তবে কাঠ পাচারের এই ভয়াবহ চিত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা গেছে। পোমরা রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিদ্দিক জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, আসামিরা জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহরাজ উদ্দিন মাসোহারার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং নিয়মিত অভিযানের দাবি করেছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পোমরা বার আউলিয়া, কাদের নগর ও কোদালা পাহাড়ি এলাকায় প্রকাশ্যে গাছ কাটার উৎসব চললেও সেখানে বন বিভাগের তেমন কোনো দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ নেই। বন আইনের ১৯২৭ সালের বিধান অনুযায়ী সংরক্ষিত বন থেকে গাছ কাটা ও পাচার দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও, যথাযথ নজরদারি ও আইনি প্রয়োগের অভাবে অসাধু চক্রগুলো বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।


বন উজাড়ের এই নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী, যা অদূর ভবিষ্যতে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলকে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে। পরিবেশবিদদের মতে, কার্বন শোষণের সক্ষমতা হারিয়ে বনভূমি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়েছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়বে স্থানীয় জনজীবনে। কাঠ পাচারের এই দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হলে কেবল লোক দেখানো অভিযান নয়, বরং বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সাথে চেকপোস্টগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে পাচারকারী সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং অবৈধ ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়গুলো অচিরেই বৃক্ষশূন্য খাঁ খাঁ প্রান্তরে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


খোলা বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. ছাইদুল ইসলাম (আবির)
✆ ০১৭৫০-৭০৭৬৩৬
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক : মো. একরামুল হক।
✆ ০১৯২৮-৩১৩১২০
ই মেইল: kholabartaonline@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ খোলা বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত